টোকিওর মতো পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়তে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী
ঢাকাসহ সারা দেশকে জাপানের টোকিওর মতো পরিচ্ছন্ন শহরে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, পরিবেশদূষণ রোধ, আবর্জনা অপসারণ, বায়ুর মান উন্নয়ন ও বিভিন্ন স্থানে গাছ লাগানোর মাধ্যমে মানুষের জন্য পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় সরকার। তার মতে, প্রান্তিক ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনমান উন্নয়নে যেসব সংস্কার সরাসরি ভূমিকা রাখে, সেগুলোই প্রকৃত সংস্কার। বুধবার জাপানের টোকিওর হোটেল নিউ ওতানিতে বাংলাদেশ কমিউনিটির আয়োজনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, শিশুদের বিকাশ, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ, বন্ধ শিল্পকারখানা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ঢাকার পরিবেশদূষণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আজকে আমাদের সঙ্গে আসা একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, টোকিও কেমন দেখলা? সে বলল, রাস্তায় কোনো ময়লা দেখি নাই।
আর ঢাকায় চারদিকে এত ময়লা।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিউজে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছেন, আমরা চেষ্টা করছি ঢাকাসহ সারা দেশটাকে পরিচ্ছন্ন করতে। চারদিকে আমাদের অনেক আবর্জনা জমে গিয়েছে। নিউজে আমরা প্রায়ই দেখি, ঢাকা শহরের বায়ু দূষিত, খুব পলিউটেড। এটাকে একটু ভালো করা, ফিল্টার করা, বিভিন্ন জায়গায় গাছ লাগানো—এসব নিয়ে আমরা কাজ করছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেখুন, কোনো একটা রাজনৈতিক দলের মধ্যে কি এসব কথাবার্তা আছে—কীভাবে পরিবেশটা ভালো করা যায়? চারদিকে এত ময়লা, এত আবর্জনা জমতে থাকলে আস্তে আস্তে মানুষ অসুস্থ হয়ে যাবে, তাই না? আবর্জনা থেকে জীবাণু, রোগ-অসুখ তৈরি হয়।
মানুষকে সুস্থ রাখতে হলে পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন করতে হবে, আবর্জনা ঠিকমতো সরাতে হবে। বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যে এসব আলোচনা শুনেছেন, পরিকল্পনা দেখেছেন? নেই।’ সাধারণ মানুষের জন্য পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলাকে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘মানুষ আবর্জনার জন্য হাঁটতে পারছে না, আবর্জনার কারণে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে, দেশের বাতাস দূষিত হয়ে যাচ্ছে—এর চেয়ে ভালো সংস্কার কী হতে পারে?’ তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো একটা পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দেশের সন্তানরা, দেশের মানুষেরা, মা-বোনেরা, নারীরা সুস্থ থাকবে—এটাই আমার কাছে বড় সংস্কার মনে হয়। যদি আমরা টোকিওর মতো ঢাকা শহরকে ক্লিন করতে পারি, জাপানের মতো ক্লিন করতে পারি।’
প্রান্তিক মানুষের উপকার হয়, এমন সংস্কার চায় সরকার দেশে সরকারের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, যেসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে একেবারে প্রান্তিক মানুষ উপকৃত হবে, বিএনপি সরকার যাতে সেগুলো করতে না পারে, সে ধরনের পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ আপনারা এখানে যারা আছেন, এই ঘরের বাইরেও ক্যামেরা ও অনলাইনের মাধ্যমে আমার কথা শুনছেন বা দেখছেন—দলমত-নির্বিশেষে সবার কাছে, প্রিয় বাংলাদেশি ভাই-বোনদের কাছে আমি এতটুকু বলব, আমি যদি এই সংস্কারকাজগুলো করতে পারি, তাহলে আপনি বা আপনার সন্তানরা ভালো থাকবেন, উপকার পাবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাহলে যারা সরকারের এই কাজগুলো বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে, তাদের বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী হবে? সমর্থনটা কাকে দেবেন? সমর্থনটা এ জন্য চাইছি—আমি বলছি না যে ভোট দেন। কাজগুলো যদি মনে করেন, আমরা সঠিক করার চেষ্টা করছি, তাহলে কাজগুলোকে সমর্থন দেন। অন্তত কাজগুলো আমরা করতে পারি।’ এ সময় উপস্থিত প্রবাসীরা তুমুল করতালির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশই বড় সংস্কার প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশসহ যেসব সংস্কারের কথা তিনি বলছেন, সেগুলোর সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ পাবেন।
একজন রিকশাচালক, সিএনজিচালক, ধনী-গরিব, চিকিৎসক, আইনজীবী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা শিক্ষক—প্রত্যেকেই এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উপকৃত হবেন। তারেক রহমান বলেন, ‘আমি একবারও বলছি না, যেসব ব্যক্তি সংস্কার-সংস্কার বলতে পত্রপত্রিকা গরম করেন, তাদের বক্তৃতায় যেসব সংস্কারের কথা আসে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে কারও উপকার হবে না বা দেশের উপকার হবে না, হবে। কিন্তু সেগুলো পরিবর্তিত হলে কতসংখ্যক মানুষ উপকৃত হবেন? হাতে গোনা কিছু মানুষ উপকৃত হবেন।’ সংস্কারের অগ্রাধিকার ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘সংস্কার বলতে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে আমি সেই সংস্কারকেই বুঝি, যে সংস্কারের সুবিধা আমার প্রান্তিক মানুষটা পায়। সংস্কার অনেক ধরনের আছে।
এয়ারকন্ডিশন রুমের সংস্কারও আছে, আর খেটে খাওয়া মানুষের জীবন একটু ভালো করার জন্য সংস্কারও আছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু আমরা মানুষের কাছে ভোটের জন্য যাই, সেজন্য আমার কাছে অগ্রাধিকার হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষের জন্য এমন কাজ করা, যাতে তার জীবনটা একটু ভালো হয়। সেই সংস্কারের কাজ করতে হলে আপনাদের সবার সহযোগিতা আমার প্রয়োজন।’
দেশের গণতান্ত্রিক মানুষের সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘আপনাদের সবার সহযোগিতা যদি থাকে, দেশের প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক মানুষের সহযোগিতা যদি থাকে, ইনশাআল্লাহ, তাহলে আমরা অবশ্যই আমাদের এই বাংলাদেশকে, আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশে গড়ে তুলতে পারব।’ এ জন্য সবাইকে পরিশ্রম, ধৈর্য ও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এ জন্য পরিশ্রম করতে হবে, ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং একসঙ্গে থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আপনাদের কাছে এই সহযোগিতা চাইছি, দোয়া চাইছি। সকলে ইনশা আল্লাহ ভালো থাকবেন।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা নিয়ে বক্তব্য
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে জাপান সফরে আসা আমার জনতা পার্টির সদস্যসচিব মো. তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এই যে এখানে আম তারেক আছে, তাকে নিয়ে নানা সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অথচ দেশের নানা সমস্যা নিয়ে কারও কোনো কথা নেই।’
শিশুদের বিকাশ, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা
অনুষ্ঠানে প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জাপানি ভাষা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শিশুদের গড়ে তোলা, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করা, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সফরসঙ্গীরা উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
অনুষ্ঠানে জাপান বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানকে আলোকচিত্র উপহার দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী মো. নিলয়সহ কয়েকজন প্রবাসী ও শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন।
আমি যখন একজন কর্মীর নিকট থেকে বেস্ট আউটপুট প্রত্যাশা করব তখন অবশ্যই আমাকে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ওই ধরনের একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমাদের দেশে সমস্যা হলো পরিবেশ তৈরি না করেই আমরা প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করি।